আট দিন পার হলেও ভোটেকোশি বন্যায় নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান মেলেনি। তাই কুশঘাস দিয়ে প্রতিকৃতি তৈরি করে তাদের শেষকৃত্য শুরু করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
ভয়াবহ ওই বন্যায় স্বজন হারানোর পাশাপাশি ঘরবাড়িও হারিয়েছেন অনেকে। ফলে মৃত স্বজনদের জন্য শোক পালনের জায়গাটুকুও মিলছে না তাদের। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দ্য কাঠমান্ডু পেস্টের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
বন্যায় সবকিছু হারিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে রাজধানী কাঠমান্ডুতে আসা অনেক পরিবারও সরকারি ও জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থাপনাগুলোতে শোক পালনের জায়গা পাচ্ছেন না।
নুয়াকোটের বাসিন্দা নিরাজন পৌডেল বন্যায় পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে তারাকেশ্বর-৫ এলাকার রুদ্রামতী মহাদেব মন্দিরের কিরিয়াপুত্রী ভবনে আশ্রয় নেন। তিনি জানান, ‘শোক পালনের সময়ে থাকার মতো কোনো জায়গা না পেয়ে তিনি ওই মন্দিরে যান। সেখনে একটি কক্ষ ফাঁকা ছিলো।
বিদুর পৌরসভার-৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নিরাজন গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় তার বাবা, মা, চাচা, চাচি এবং চাচাতো বোনকে হারান। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) তিনি ও তার এক চাচাতো ভাই কুশঘাস দিয়ে পাঁচজনের প্রতিকৃতি তৈরি করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।
রুদ্রামতী মহাদেব মন্দির ও কিরিয়াপুত্রী ভবনের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। তবে ভোটেকোশি বন্যায় স্বজন হারানো পরিবারগুলো শোক পালনের জন্য জায়গা চাওয়ায় মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটি নির্মাণাধীন ভবনটি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ রাজ কুমার ফুয়াল বলেন, ‘পুরো দেশ এখন শোকে মুহ্যমান। নিহতদের স্বজনদের সহায়তা করতে বন্যার পর আমরা এই কিরিয়াপুত্রী ভবন খুলে দিয়েছি। নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় শোক পালনকারীদের কিছুটা অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে।’ বর্তমানে কিরিয়াপুত্রী ভবনে ৮টি পরিবার রয়েছে। প্রতিটি পরিবারই রাসুয়া বন্যায় তিন থেকে পাঁচজন স্বজনকে হারিয়েছে।
সামাজিক সংগঠক সুদর্শন চাপাগাইন বলেন, ‘অনেক মানুষ শোক পালনের জন্য জায়গা চাইলেও আর একটি পরিবারকেও রাখার মতো জায়গা নেই।’
রুদ্রামতী মহাদেব মন্দির ও কিরিয়াপুত্রী ভবনের মতো কাছের গুপ্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরের কিরিয়াপুত্রী ভবনের ৮টি কক্ষও ভোটেকোশি বন্যায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর দখলে। সেখানে শোক পালনে আগত মানুষদের জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটি তাঁবু খাটিয়ে আরও ৬টি কক্ষ তৈরি করেছে।
শোক পালন ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে মাত্র এক হাজার রুপি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি।
গুপ্তেশ্বর মন্দির কিরিয়াপুত্রী ভবন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ঋষি প্রসাদ নেপাল বলেন, ‘আমরা তাদের গ্যাসের ব্যবস্থা করে দিতে পারছি না। পরিবারের সদস্যদেরই গ্যাস সঙ্গে আনতে হচ্ছে। এলপি গ্যাস এখন আর কেনা যাচ্ছে না।’ বিদুর পৌরসভার-৭ নম্বর ওয়ার্ডের রাজন রাইলা বন্যায় তার মা, ছোট ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রীকে হারিয়েছেন। বুধবার পশুপতি আর্যঘাটে কুশঘাসের প্রতিকৃতি তৈরি করে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর শোক পালনের জন্য যান গুপ্তেশ্বর মন্দিরে।
নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের আর জীবিত বা মৃত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আর মরদেহ পাওয়া গেলেও পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অনেক মরদেহ গণকবরে দ্রুত দাফন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। ফলে স্বজনদের প্রতীকী শেষকৃত্য করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ থাকছে না।
বন্যায় শুধু বিদুর পৌরসভার-৭ নম্বর ওয়ার্ডের সোল এলাকায় প্রায় ১০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন।
গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে তীর্থযাত্রী, পর্যটক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 




















